রবিবার ১৬ আগস্ট ২০২৬ - ১৩:১৩
‘রাষ্ট্রের অস্ত্র’ হলো যে অস্ত্র ইরাককে রক্ষা করে; প্রতিরোধের অস্ত্রের বিষয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়

বাগদাদের জুমার ইমাম আয়াতুল্লাহ সৈয়দ ইয়াসিন মুসাভি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের অস্ত্র’ বলতে এমন যেকোনো অস্ত্রকে বোঝায়, যা ইরাককে রক্ষা করে। তিনি প্রতিরোধের অস্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে আমেরিকার হস্তক্ষেপকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ককে ইরাকের সেনাবাহিনীকে ওয়াশিংটনের অস্ত্রের একচেটিয়া নির্ভরতা থেকে বের করে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,  বাগদাদের জুমার ইমাম এবং নাজাফের হাওজা ইলমিয়ার বিশিষ্ট শিক্ষক আয়াতুল্লাহ সৈয়দ ইয়াসিন মুসাভি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ‘অস্ত্রের ওপর রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ’ নামে পরিচিত বিষয়টি নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের অঙ্গনে এ নিয়ে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি বা ইরাককে দুর্বল করার লক্ষ্যে নির্ধারিত রাজনৈতিক এজেন্ডার ভিত্তিতে ‘রাষ্ট্রের অস্ত্র’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রচেষ্টার বিষয়ে সতর্ক করেন।

বাগদাদের জুমার খুতবায় আয়াতুল্লাহ মুসাভি বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অস্ত্রের’ বিরোধিতা একটি সুস্পষ্ট ও স্থির নীতি। ধর্মীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্বও বারবার অস্ত্রকে রাষ্ট্রের সেবায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। তবে মূল প্রশ্ন হলো বৈধ অস্ত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা; নাম বা পদবি নয়।

তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্ব অস্ত্রকে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে এবং ইরাকের অভিজ্ঞতাও আইনের কাঠামোর বাইরে থাকা অস্ত্রের বিপদ প্রমাণ করেছে। তবে কিছু পক্ষ ‘রাষ্ট্রের অস্ত্র’ বলতে কেবল সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বোঝানোর চেষ্টা করছে।

বাগদাদের জুমার ইমাম স্পষ্ট করে বলেন: বিষয়টি নাম বা পরিচয়ের নয়; বরং রাষ্ট্র ও দেশকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে অস্ত্রটির বাস্তব ভূমিকা ও কার্যকারিতাই মূল বিষয়।

মসুলের পতন: রাষ্ট্রের অস্ত্র সংজ্ঞায়নের একটি পরীক্ষা

আয়াতুল্লাহ মুসাভি ২০১৪ সালে মসুলের পতনের ঘটনাকে এমন একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন, যা প্রমাণ করে-শুধু কোনো সামরিক প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পরিচয় থাকলেই দেশ সুরক্ষিত থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

তিনি বলেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চারটি সামরিক ডিভিশন ভেঙে পড়ে এবং তাদের উন্নত অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ সম্পদ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশের হাতে চলে যায়। বিপরীতে, ধর্মীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ‘ওয়াজিব জিহাদ’ সংক্রান্ত ফতোয়ার পর যারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন, তারা সে সময় সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তার জন্য ইরাকের জনগণের ওপর নির্ভর করেছিলেন।

আয়াতুল্লাহ মুসাভি বলেন: হুসাইনি মাওকিবগুলোই কয়েক লাখ স্বেচ্ছাসেবীর খাবার সরবরাহের দায়িত্ব নিয়েছিল, অথচ সামরিক ব্যারাকগুলো অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের সংকটে ভুগছিল।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, আল-হাশদ আশ-শাবি (পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস-পিএমএফ) ইরাকি রাষ্ট্রের অস্ত্রেরই একটি অংশ, কারণ ধর্মীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ফতোয়ার প্রতিক্রিয়ায় এবং ইরাককে রক্ষার জন্য তারা মাঠে নেমেছিল। তাঁর মতে, বৈধতা নির্ধারণ করতে হবে রাষ্ট্রের সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক এবং দেশরক্ষার ভিত্তিতে-শুধু নাম বা প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তিতে নয়।

বাগদাদের জুমার ইমাম বলেন: আল-হাশদ রাষ্ট্রের অস্ত্র। প্রতিরোধের অস্ত্রও সেই অস্ত্র, যা ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারে ভূমিকা রেখেছে-এটি এমন একটি বাস্তবতা, যা আমেরিকানরাও স্বীকার করেছে।

তিনি প্রতিরোধের অস্ত্রকে ‘মিলিশিয়াদের অস্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করাকে এর ভূমিকা বিকৃত করার প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করেন। তাঁর ভাষায়, এটি ‘প্রতিরোধ ও মুক্তির অস্ত্র’, এবং এর প্রতি সম্মান দেখানো উচিত; কারণ এটি ইরাকের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে।

আমেরিকার ওপর ইরাকি সেনাবাহিনীর অস্ত্রনির্ভরতার সমালোচনা

এরপর আয়াতুল্লাহ মুসাভি ইরাকের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ককে সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে অস্ত্র সংগ্রহ এবং মার্কিন অস্ত্রের একচেটিয়া নির্ভরতা থেকে ইরাকি সেনাবাহিনীকে বের করে আনার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন: আপনি যদি সামরিক প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করতে চান, তাহলে অন্যান্য দেশ থেকে বিমান ও ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে এবং সেনাবাহিনীর সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে হবে-এমনভাবে, যাতে ইরাকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত হয়।

বাগদাদের জুমার ইমাম একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন দূত টম বারাকের তীব্র সমালোচনা করেন। প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রের বিষয়ে ইরাককে সময়সীমা বেঁধে দেওয়াকে তিনি দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন: ইরাকের সার্বভৌম সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার কোনো বিদেশি শক্তির নেই।

তিনি ইরাকি সরকারের ওপর নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টারও সমালোচনা করেন।

সব সশস্ত্র সংগঠনের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ডের দাবি

আয়াতুল্লাহ মুসাভি আরও বলেন, এমন অন্যান্য অস্ত্রও রয়েছে, যেগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সেগুলো নিয়েও আলোচনা করা উচিত। এ প্রসঙ্গে তিনি পেশমার্গা বাহিনী এবং বিদেশি পক্ষগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সংগঠনের কথা উল্লেখ করেন এবং সব সশস্ত্র সংগঠনের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগের দাবি জানান।

তিনি ইরাকে বিদেশি সামরিক উপস্থিতির সব ধরনের অবসানেরও আহ্বান জানান-তা মার্কিন বাহিনী হোক কিংবা তুর্কি বাহিনী। তাঁর মতে, ইরাকের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন ইরাকি বাহিনী থাকা অপরিহার্য। দেশটির ভবিষ্যৎ ইরাকের জনগণের হাতে এবং তাদের ইচ্ছার ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে হবে, বিদেশিদের নির্দেশে নয়।

সবশেষে আয়াতুল্লাহ সৈয়দ ইয়াসিন মুসাভি বলেন, আমেরিকা যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শর্ত মেনে না নেয়, তাহলে তাকে অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হতে হবে। তিনি আরও বলেন, ইরান এখন ‘সামরিক ফয়সালার’ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং ইরানি বাহিনীর আমেরিকান বাহিনীকে অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করার সক্ষমতা রয়েছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha